HomeMSME দিবস ২০২৫: ক্ষুদ্র উদ্যোগে বড় স্বপ্ন, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র

MSME দিবস ২০২৫: ক্ষুদ্র উদ্যোগে বড় স্বপ্ন, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র

আজ ২৭ জুন, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) দিবস। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য: টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হিসেবে এমএসএমই খাতের ভূমিকা সুদৃঢ়করণ। 

বিশ্ব অর্থনীতিতে MSME খাতের অবদান স্বীকৃতি  এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এগিয়ে নিতেই জাতিসংঘ ২০১৭ সালে দিবসটি ঘোষণা করে।

বিশ্বব্যাপী মোট ব্যবসার প্রায় ৯০ শতাংশই MSME, যা বিশ্বের ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থান ও ৫০ শতাংশ GDP-তে অবদান রাখে।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান: MSME-র শক্ত ভিত্তি

বিবিএস কর্তৃক পরিচালিত অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ এর তথ্যমতে বর্তমানে দেশে প্রায় ১.১৮ কোটি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে এবং প্রায় ৩.০৮ কোটি জনবল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত আছে। অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ অনুযায়ী দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯৯.৯৩ শতাংশ এবং মোট জনবলের ৮৫.৮৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতের।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৭.০৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের (২০২২) মতে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০.৪ শতাংশ।

বাংলাদেশে MSME খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এসএমই ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:

* MSME প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা: প্রায় ৮৭ লাখ

* কর্মসংস্থান: দেশের ৮৭.৫% শ্রমশক্তি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে MSME-র সঙ্গে যুক্ত

* নারী নেতৃত্বাধীন MSME: আনুমানিক ৮%, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে

* ব্যাংক ঋণে প্রবেশাধিকার: মাত্র ২১% উদ্যোক্তা সহজ শর্তে ঋণ পান

* ই-কমার্সে সক্রিয় MSME: ১.২ লাখের বেশি প্রতিষ্ঠান

* রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম বড় সরবরাহকারী – বিশেষ করে হস্তশিল্প, ফার্নিচার, লেদার ও এগ্রো-বেইজড পণ্য

এছাড়াও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)–এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৫–৮ লক্ষ, যা মোট SME–এর প্রায় **২৪.৬%** । এসব SME–তে প্রায় ৮.৪ মিলিয়ন (৮৪ লাখ) কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসার মালিকদের মধ্যে ৭.২% নারীরা রয়েছেন। অর্থাৎ, নারী উদ্যোক্তারা শুধুমাত্র “সংখ্যা” হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান ও GDP–তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

কিন্তু এখনও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ—পুঁজি সংকট, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা ও তথ্যঘাটতি।

বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা সমাজ ও পরিবারের বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তবে, ব্যাংক ঋণ পেতে জটিলতা ও প্রশিক্ষণ ঘাটতির কারণে অনেকেই থমকে যাচ্ছেন মাঝপথে। তবে সুখবর হলো, সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করছে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা: ছোট উদ্যোগ, বড় পরিবর্তন

📌 ১. গ্রামীণ MSME বিপ্লব

উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোগ যেমন—ঘরোয়া খাবার, হস্তশিল্প, প্যাকেজিং ব্যবসা, এবং ফেসবুক-বেইজড উদ্যোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

📌 ২. নারী উদ্যোক্তার উত্থান

“জয়িতা”, “শেকড়”, “উদ্যোক্তা হাট” প্রভৃতি প্ল্যাটফর্মে নারীরা এখন ছোট পরিসরের পণ্য নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মার্কেটে প্রবেশ করছেন।

📌 ৩. ডিজিটাল সংযুক্তি

MSME খাত এখন মোবাইল পেমেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে কার্যকরভাবে সক্রিয়।

Bkash, Nagad-এর মতো আর্থিক প্ল্যাটফর্মগুলো MSME-এর অন্তর্ভুক্তিকে সহজ করেছে।

রিচালিত নারী উদ্যোক্তা তহবিল, SME ফাইন্যান্স পলিসি ২০১৯, এবং এসএমই ক্লাস্টার প্রকল্প– এই খাতকে উৎসাহিত করছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ৯০ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান MSME খাতে পড়ে। এরা শুধু কর্মসংস্থানই নয়, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই ২০১৭ সাল থেকে ২৭ জুনকে আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপন করা হচ্ছে MSME দিবস হিসেবে।

বিশ্বব্যাপী নতুন নির্দেশনা ও ট্রেন্ড:

১. ডিজিটাল MSME:

বিশ্বব্যাপী MSME গুলো এখন প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। ভারতে “Digital MSME Scheme”, কেনিয়ায় “Jumia Academy”-র মতো উদ্যোগে উদ্যোক্তারা ক্লাউড সফটওয়্যার ও ডিজিটাল মার্কেটিং শিখছেন।

২. সবুজ MSME:

ক্লিন এনার্জি, রিসাইকেলিং ও পরিবেশবান্ধব প্রোডাকশনকে প্রাধান্য দিয়ে MSME-কে “Green Economy” তে রূপান্তর করা হচ্ছে।

৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন:

আফ্রিকার MoKash এবং দক্ষিণ আমেরিকার Mercado Crédito ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ ও বিকল্প ক্রেডিট স্কোর সুবিধা দিচ্ছে।

৪. বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ:

ছোট ব্যবসাগুলোকে Amazon, Alibaba, Etsy-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা হচ্ছে। WTO ও UNESCAP MSME রপ্তানির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ড. শাহীন ইসলাম বলেন,“বাংলাদেশে MSME খাতকে পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল এবং গ্লোবাল সংযুক্তির দিকে নিয়ে গেলে তা আগামী দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় ইঞ্জিন হতে পারে।”

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (DCCI) সাবেক সভাপতি বলেছেন, “MSME খাতকে ডিজিটালভাবে সক্ষম করে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ আগামী দশকে টেকসই উন্নয়নের একটি মডেল হতে পারে।”

বাংলাদেশ এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বাজার সংযুক্তির মাধ্যমে MSME খাতকে রূপান্তর করতে পারলে এটি ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গঠনের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।”

এমএসএমই উন্নয়নে করণীয় ও দিকনির্দেশনা:

✅ উপজেলা পর্যায়ে MSME ইনোভেশন হাব

✅ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ ও প্রশিক্ষণ

✅ জাতীয় MSME রেজিস্ট্রি তৈরি

✅ ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবসা রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স নীতিমালা

✅ MSME এক্সপোর্ট পলিসি ও ই-কমার্স পাসপোর্ট

✅ উদ্যোক্তা-বান্ধব ব্যাংকিং নীতি

✅ ট্যাক্স হালকা করা

✅ ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো

✅ প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা

✅ স্থানীয় মার্কেট থেকে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে সংযুক্তির উদ্যোগ

জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে শিল্প খাতের অবদান ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে এমএসএমই খাতকে শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। একইসাথে এসডিজি ২০৩০ অর্জন এবং এলডিসি থেকে উত্তরণে এই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের দিনটি শুধু উদযাপনের নয়, বরং বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ গ্রহণের সময়।

MSME মানে ‘Small Business’, কিন্তু এই ‘Small’ উদ্যোগের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস ২০২৫ হোক উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও এসএমই খাতের অগ্রযাত্রায় নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টির মাইলফলক।

সেতু ইসরাত, উদ্যোক্তা বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments