উদ্যোক্তা-শিল্পা

একজন সিঙ্গেল মাদারের একজন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। একজন সিঙ্গেল মাদারের সন্তান নিয়ে একা জীবন যাপন করাটা চারটিখানি কথা নয় ৩৪ বছর বয়সী একজন সিঙ্গেলমাদার, যিনি স্কুলের গণ্ডিটাও পার করতে পারেননি ১০ম শ্রেণীর পরই ঝরে পড়েন।

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের হাসানের অধিবাসী শিল্পা জন্ম স্বচ্ছল এক কৃষক পরিবারে। মা-বাবা আর এক ভাইয়ের সংসারে কখনই কোন কাজ করার জন্য জোর করা হত না। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের রান্না করতে খুব ভালোবাসতেন তিনি।

২০০৫ সালে শিল্পা তার ৩ বছরের ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে স্বামী রাজ শেখরের সাথে ম্যাঙ্গালোরে পাড়ি জমান। সংসার খুবভালোই চলছিল। কাজের সুবাদে ২০০৮ সালে স্বামী ব্যাঙ্গালোরে যান।সেই দেখাই ছিল শিল্পার সাথে তার শেষ দেখা। রাজশেখর একদম যোগাযোগের বাইরে চলে গেল। দুই পরিবারের লোকজন তাকে খোঁজার অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু তারকোন হদিস মিললো না। এদিকে শিল্পা স্বামীকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়লেন। বাসা ভাড়ার টাকা তো দূরের কথা বাচ্চার দুধ কেনার জন্যও তার কাছে ছিল না।

শিল্পা গভীর হতাশায় ডুবে গেলেন। এদিকে তার বাবা-মাও অসুস্থ হয়ে পড়ল।হাসপাতালের বিল, বাচ্চা আর ছোট ভাইয়েরদেখাশুনা করার জন্য তার হাতে  যথেষ্ট অর্থও মজুদ ছিল না।এক পর্যায়ে উপায়ান্তর না দেখে শিল্পা একটা সাইবারক্যাফেতে চাকরি নেন।পরে একটা প্রসাধনীর দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজও করেন।কিন্তু মাত্র ৬,০০০ রুপি বেতন দিয়ে ৪ সদস্যের পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে ওঠে।

ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে সময় কাটাতে বেশ ভালো লাগতো তার।টেলিভিশনে রান্নার অনুষ্ঠানও খুব  আগ্রহ করেদেখতেন।মায়ের কাছ থেকেই রন্ধন শিল্পে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। কর্ণাটকের খাবার খুব ভালো বানাতেন শিল্পা।পরিবারের সবাই তার হাতের রান্নার খুব প্রশংসা করত।

ছোট ভাইকে নিজের এক পরিকল্পনার কথা জানান। দুই ভাই-বোন মিলে সিদ্ধান্ত নেন খাবারের ব্যবসা করবেন। কিন্তু বড় সমস্যা ছিল মূলধন। ব্যাংক থেকে লোন নিতে চাইলেন। অনেক ঘুরেও লোন পেলেন না।

অবশেষে ছেলের পড়াশুনার জন্য জমিয়ে রাখা ১ লক্ষ রুপি ব্যাংক থেকে তুলে নেন। একটা পিকআপ ট্রাক কিনে ব্যবসা শুরু করেন।ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সময়ে তিনি তার নেয়া ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের জন্য অনেক সমালোচনার স্বীকার হন যার মধ্যে ছিল পুরান গাড়ি না কিনে নতুন গাড়ি কেনা, কোন শপিং মল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে জায়গা নির্ধারন না করা ইত্যাদি।

সব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে দিয়ে ২০১৫ সালে শেষের দিকে শিল্পা তার ব্যবসা শুরু করেন। তার দুর্বার সাড়াসমালোচকদের হতবাক করে দিয়েছিল। ৪টা থেকে ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকা এই ফুড কার্টে প্রতিদিন খেতে আসে অসংখ্য মানুষ, প্রতিদিন আয় হয় ৩,০০০ থেকে ৭,০০০ রুপি।

৮০% ক্রেতাই স্থানীয় যাদের মধ্যে আছে ডাক্তার, ছাত্র, আইটি পেশাজীবী যারা ঘরের তৈরী খাবার খোঁজেন। অনলাইনে যাতে শিল্পার ফুড কার্টকে খুঁজে পাওয়া যায় সেজন্য স্থানীয় কিছু ছাত্র ছাত্রী মিলে তার ফুড কার্টটিকে গুগলে ম্যাপিং করে দিয়েছে। শিল্পার দৈনন্দিন মেনুতে প্রধানত আছে ৩ ধরনের রুটি। এছাড়াও আছে দক্ষিণ ভারতীয় নানান মুখরোচক খাবার। শিল্পা খাবারের উপকরণগুলো তার শহর থেকে কিনে আনেন।

খাবারে ঘরের স্বাদ রাখতে তিনি বাড়তি স্বাদ কিংবারঙ যোগ করেন না। শিল্পার লক্ষ্য কম দামে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি ও বিক্রি করা শিল্পার পুরো পরিবার কাজে জড়িত। তার মা-বাবা সবজি আর মুদি দ্রব্য সংগ্রহ করেন। শিল্পা আর ছোটভাই মিলে ফুড কার্ট চালান। এছাড়া তিনি তার ১২ বছর বয়সী ছোট্ট ছেলেরও দেখাশুনা করছেন।

 

(তথ্যসূত্র ও ছবি ইন্টারনেট থেকে)

সুরাইয়া আলম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here