বরেন্দ্র অঞ্চলের বাড়ির আঙিনায় ‘স্পিরুলিনা’

0
উদ্যোক্তা রাকিবুল সরকার

রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে যেখানে ফসল, শাক-সবজি চাষের কথা ভাবাই অবাক কাণ্ডের মতো, সেখানে বাড়ির আঙিনায় সামুদ্রিক শৈবাল স্পিরুলিনা চাষ করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে দিয়েছেন তানোর উপজেলার রাকিবুল সরকার। বর্তমানে চার হাজার টাকা কেজি দরে স্পিরুলিনা বিক্রয় করছেন এই উদ্যোক্তা। মাসে ১৫ কেজি স্পিরুলিনা তুলতে পারছেন প্রজেক্ট থেকে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী স্পিরুলিনাতে দুধের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, গরুর মাংসের চেয়ে ৬ গুণ বেশি আমিষ এবং গাজরের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি ভিটাক্যারোটেন রয়েছে। এছাড়াও পর্যপ্ত পরিমাণ, সোডিয়াম, ভিটামিন-সি তে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক শৈবাল ‘স্পিরুলিনা’। দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সবখানেই রয়েছে সবুজ হিরা খ্যাত স্পিরুলিনার চাহিদা।

বর্তমান বিশ্বে স্পিরুলিনা একটি পরিচিত সুপারফুড যা ট্যাবলেট এবং গুঁড়া উভয় আকারেই সেবন করা যায়। বিশ্বের অন্তত ২২টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত স্পিরুলিনা এতটাই পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য পরিপূরক যে নাসা (NASA) ১৯৮৮ সালে এটিকে নভোচারীদের খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশও বাণিজ্যিকভাবে স্পিরুলিনা চাষে সফলতা অর্জন করেছে।

তানোরের সন্তান মোঃ রাকিবুল সরকার। পড়াশোনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজশাহী নগরীতে। সেখানে ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত হন। তখন থেকেই নিজ গ্রামের বাড়ির আশে পাশে একটি-দুটি করে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগাতেন।

পরবর্তীতে পড়াশোনা শেষ হলে চাকরি না মেলায় পুকুরে মাছ চাষ এবং মুরগি ও গরুর খামার শুরু করেন। আগে থেকে ১/২ টি করে গাছ লাগানোর ফলে বৃহৎ পরিসরে মিশ্র ফলের বাগান করেন। বর্তমানে এই উদ্যোক্তার বাগানে রয়েছে খাটো জাতের ভিয়েতনাম নারকেল। আর নারকেল বাগানের ভেতর দুই বিঘা জমিতে শ্বেত চন্দন, মাল্টা, অ্যাভাক্যডো, ড্রাগন, আলুবোখারা, ত্বীন ফল, ভিয়েতনামী আতাসহ বেশ কিছু ফল রয়েছে উদ্যোক্তা রাকিবুল সরকারের নর্দান এগ্রো ফার্মে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জাতির সামনে ব্লু ইকোনমি (সুনীল অর্থনীতি) তুলে ধরেন, উদ্যোক্তা রাকিবুল সরকার তখন এই বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ধারণা নেন। এক পর্যায়ে উদ্যোক্তা সামুদ্রিক শৈবাল স্পিরুলিনা চাষ সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তিনি এই তথ্যও পান যে স্পিরুলিনা নামক এই সামুদ্রিক শৈবাল সমুদ্রের বাইরে নিজ বাড়ির আঙিনাতেও চাষ সম্ভব। তখনই উদ্যোক্তা স্পিরুলিনা চাষের জন্য মন ঠিক করেন। ঝিনাইদহ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ গ্রামেই ২০২১ এ স্পিরুলিনা ও পুকুরে মুক্তা চাষ শুরু করেন তিনি।

স্পিরুলিনা চাষের জন্য উদ্যোক্তার সেসময় গুনতে হয়েছিল প্রায় চার লাখ টাকা। তিনি উদ্যোক্তা বার্তাকে বলেন, “বাড়ির আঙিনায় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ স্পিরুলিনা চাষ করতে আমি ১৭ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতার একটি জার তৈরি করি। এবং সমুদ্রের নোনা পানির যা যা গুণ থাকে সেভাবে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের মাধ্যমে পানি প্রস্তুত করি। তারপর ঝিনাইদহ থেকে সংগ্রহ করা স্পিরুলিনা বীজ আমরা পানিতে মেশাি। প্রথম দিকে আমার স্বচ্ছ পলিথিন, প্লাস্টিক সিট (১৪ ফিট লম্বা এবং ৩২ ইঞ্চি প্রস্থ) তৈরি করে নেই। এরপর কাঠের স্ট্রাকচার, জারে সিমেন্টের পার্টিশন, পাম্পসহ পরিপূর্ণ কাঠামো গড়তে চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। যদিও আমার কিছু ভুলের জন্য এত অর্থ গুণতে হয়েছে, কারণ আরও অল্প খরচে কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। বীজ মেশানোর ১৫ থেকে কুড়ি দিনের মধ্যে আমরা স্পিরুলিনা সংগ্রহ করতে পারি। সংগ্রহের পর এগুলো শুকানো হলে বিক্রয়যোগ্য হয়। এটার চাহিদা দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সবখানেই। আমার সাথে চারজন সহযোদ্ধা কাজ করছেন।”

উদ্যোক্তা রকিবুল সরকারের স্পিরুলিনা মানবস্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ এটি নিয়ে গবেষণা চালাতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু দল তার প্রজেক্ট পরিদর্শন করে ফলাফল জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এটি মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি ডিপার্টমেন্ট এর ডঃ সাবরিনা নাজ এসে পরিদর্শন করেন ও স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করে মানবদেহের জন্য নিরাপদ বলে প্রত্যায়ন দেন।বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালকও এই ফার্ম পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করে পজিটিভ রেজাল্ট জানিয়েছেন। এছাড়াও সম্প্রতি পিকেএসএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আশ্রয় এনজিও’র মাধ্যমে উদ্যোক্তার ফার্ম পরিদর্শন করে দেশ-বিদেশে এই ফার্মের স্পিরুলিনা বাজারজাত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

উদ্যোক্তা রাকিবুল সরকারের জন্ম থেকে বেড়ে উঠা রাজশাহীর তানোরে। রাজশাহী কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। উদ্যোগের পাশাপাশি একটি কলেজে শিক্ষকতাও করছেন রাকিবুল সরকার।

তামান্না ইমাম
উদ্যোক্তা বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here