নতুন সম্ভাবনায় ঐতিহ্যের শতরঞ্জি

0

বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্য রংপুরের শতরঞ্জি। এটি বয়ন কৌশলের দিক থেকে আধুনিক ট্যাপেস্ট্রির অনুরূপ একটি শিল্প । একসময় বিত্তবানদের আভিজাত্যের অন্যতম প্রতিক ছিল শতরঞ্জি যা সাধারণ আসন, শয্যা, বিছানা, সভা বা মজলিশ কিংবা জলসায় বসার জন্য ব্যবহার হতো। তাছাড়া দেয়ালমাদুর হিসেবেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল শতরঞ্জি যা এখন দেশের অন্যতম হস্তশিল্পজাত রপ্তানিপণ্য। বিশ্বের প্রায় ৫০টির বেশি দেশে শতরঞ্জি রপ্তানি হচ্ছে। ২০২১ সালে রংপুরের শতরঞ্জি বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই) হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

শতরঞ্জির ইতিহাস প্রায় কয়েকশ বছরের। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে শতরঞ্জি ব্যবহার হতো। জমিদারদের ভোজনের আসনেও ছিল এর ব্যবহার। বংশ পরম্পরায় চলে এসেছে এই পেশা। ১৮৩০ সালে নিসবেত নামক জনৈক ব্রিটিশ কালেক্টর তৎকালীন রঙ্গপুর নগরের শহরতলী পীরপুর গ্রামে গিয়ে শতরঞ্জি দেখে মুগ্ধ হন। এর প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক অবদান রাখেন তিনি। তার সম্মানে আজো এলাকাটির নাম নিসবেতগঞ্জ। সেসময় শতরঞ্জি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় এবং বিভিন্ন স্থানে রপ্তানিও হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে সমগ্র ভারত, শ্রীলংকা, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ নানা দেশে প্রচুর শতরঞ্জি বিক্রি হতো। মূলত ভারতভাগের পরেই শতরঞ্জি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে।

শতরঞ্জির বুননশৈলী সম্পূর্ণ আধুনিকতামুক্ত একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এর প্রধান উপকরণ সুতলি। বাঁশ এবং রশি দিয়ে ছোট বড় চরকার মাধ্যমে সুতা দিয়ে টানা প্রস্তত করে প্রতিটি সুতা গণনা করে জ্যামিতিক মাপে হাত দিয়ে বুনন শিল্পীরা নিজস্ব মননে নকশা করা শতরঞ্জি তৈরি করেন। শতরঞ্জি তৈরিতে নিয়োজিত একজন শ্রমিকের এক বর্গফুট শতরঞ্জি বানাতে সময় লাগে এক থেকে তিন ঘণ্টা। শতরঞ্জি তৈরিতে সাধারণত দুই ধরনের মোটিফ নকশা ব্যবহার করা হয়। একটি প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী নকশা এবং অপরটি আধুনিক নকশা। শিল্পীর নিপূণতায় শতরঞ্জির নকশা হিসেবে এসেছে নারীর মুখ, পশুপাখি, রাখাল বালক, কলসি নিয়ে রমণী, নৌকা, রাজা-রাণী, দেবদেবী, পৌরাণিক চরিত্র ও প্রাকৃতিক দৃশ্য। এছাড়া ক্রেতার চাহিদা অনুসারেও ডিজাইন করা হয়। এসব ডিজাইনে লাল, কালো বা নীল রঙের প্রাধান্য পরিলক্ষিত। সাধারণত আয়তকার হয়ে থাকে, তবে বর্গাকার, ডিম্বাকারসহ যে কোনো আকৃতির হতে পারে শতরঞ্জি। সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যে ৩০ ইঞ্চি, প্রস্থে ২০ ইঞ্চি এবং সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট ও প্রস্থ ২০ ফুট পর্যন্ত হলেও যে কোনো পরিমাপেই শতরঞ্জি বোনা যায়। আকৃতির বিষয় নির্ভর করে ক্রেতার চাহিদার ওপর।

শহরে আধুনিক মেশিনের তৈরি পণ্যের ভিড়ে হাতে তৈরি শতরঞ্জির বাজার কমতে শুরু করে। বর্তমানে রংপুরে খুব ক্ষুদ্র পরিসরে শিল্পটি টিকে আছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, বিপণনে পরিকল্পনাহীনতা, বাজার সম্প্রসারণের কোনো আন্তরিকতা না থাকায় কারিগররা পেশা পরিবর্তন করতে শুরু করে। তাছাড়া মধ্যসত্ত্বভোগীদের কারণে শতরঞ্জি শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা তাদের শ্রমের বিপরীতে মজুরি পায় খুব কম। ফলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। এসব সীমাবদ্ধতার ভেতর আবহমান কাল ধরে নিজস্ব ঢঙে শতরঞ্জি শিল্পীরা সহজাত শিল্প প্রতিভায় শতরঞ্জি নির্মাণ করে যাচ্ছেন।

নতুন করে এই হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়ার পেছনে আছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ১৯৭৬ সালে সরকারিভাবে শতরঞ্জি তৈরির একটি প্রকল্প গ্রহণ করে এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সে উদ্যোগ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তারপরও সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে শতরঞ্জির উৎপাদন শুরু হয়। এই শতরঞ্জি এখন শুধু নিসবেতগঞ্জের গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। রংপুরজুড়ে শতরঞ্জি হচ্ছে। বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং বাংলাদেশেও এর চাহিদা ব্যাপক। ‘কারুপণ্য’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে শতরঞ্জি তৈরির পাঁচটি কারখানা। আরও রয়েছে ‘নীড় শতরঞ্জি’, ‘শতরঞ্জি পল্লি’, ‘চারুশী’ শতরঞ্জি কারখানা। কারখানা ছাড়াও নিসবেতগঞ্জ এলাকায় বাড়ির আঙিনা কিংবা উঠানে, বাড়ির ছাউনির নিচে নিপুণ হাতে চলছে শতরঞ্জি বুননের কাজ। এসব কারখানায় প্রায় সাত হাজার নারী-পুরুষ কাজ করছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে রপ্তানি বাণিজ্যে হস্তশিল্পের ৬০ শতাংশই রংপুরের শতরঞ্জি।

পূর্বপুরুষের পুরনো পেশাকে বর্তমান প্রজন্ম উপস্থাপন করছে একটু ভিন্ন মাত্রায়। অনেক নতুনত্ব পেয়েছে বিলুপ্তপ্রায় শতরঞ্জি। অনেক নতুন উদ্যোক্তার পছন্দের শীর্ষে রয়েছে এটি। শতরঞ্জির ব্যাগ, পাপোষ, বিছানার চাদর, শ্যাগি, ফ্লোর মেট, একরেলিক ফ্লোর মেট, ডোর মেটে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে নতুনরূপে ফিরিয়ে আনছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। তাদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি নজর কাড়ছে সবার।

সেতু ইসরাত,
উদ্যোক্তা বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here