উদ্যোক্তা ও তার সহযোগী বান্ধবি - আবৃতা খানম ও দিবা শারমীন বৃষ্টি

আবৃতা খানমের স্বপ্ন ছিল সে বড় হয়ে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু কোনো এক কারণে বিজ্ঞান বিভাগে পড়া হলো না, পড়তে হল ব্যবসায় শিক্ষায়। তাই বলে কি স্বপ্ন থেমে থাকবে আবৃতার? না স্বপ্ন থেমে থাকেনি, সব কিছু পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হল আবৃতার স্বপ্নও। কি সেই স্বপ্ন? বড় হয়েই বা কি হল আবৃতা? চলুন জেনে নিই:

বিয়ে, ঈদ কিংবা যে কোন জমকালো অনুষ্ঠান হোক না কেন হাত রাঙানো যেন বাঞ্ছনীয় হয়ে ওঠে। মেয়েদের হাত রাঙাতেই হবে মেহেদি দিয়ে। বিয়ে হলে তো কথায় নাই; আর সেই বিয়েতে যদি থাকে মেহেদি নাইট। তাহলে সেই রাতে কনে থেকে শুরু করে সবাই মেহেদি দিয়ে হাত রাঙায়। মেহেদি নাইট, গায়ে হলুদে একটু নতুন ধরণের গহনা ছাড়া যেন এখনকার গায়ে হলুদটা ঠিক মানায় না। আর বিয়ে মানেতো এখন ওয়েডিং বলেই সবাই জানে আর ওয়েডিং এ ছবি তোলা হবে না তা কি হয়? সেই জন্য আছে ফটোগ্রাফার । এই সবকিছু নিয়েই আবৃতা খানমের “ইনোভেটিভ টাচ”।

PicsArt 09 05 02.05.04২০১২ সালে আবৃতা খানম তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। স্কুলে কোনো এক কালচারাল প্রোগাম থেকেই শুরু হয় ইনোভেটিভ টাচের যাত্রা। আবৃতার মাথায় থাকা মেহেদির ডিজাইন নিয়ে বিজনেস করার চিন্তা থেকে স্কুলে স্টল দিয়ে ফেলেন এবং খুব ভাল সাড়া পান। যার ফলে মেহেদি দিয়ে হাত রাঙিয়ে দেয়ার চিন্তাটা আরো প্রখর ভাবে চেপে বসল তার। কিছুদিন পরেই মাধ্যমিক পরীক্ষা; সবাই সালামি দিয়ে দোয়া করেছেন। সেই সালামির ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। সাথে “ইনোভেটিভ টাচ” নাম দিয়ে খুলে ফেলেন অনলাইন পেজ। পার্টনার হিসেবে পাশে পেয়েছেন স্কুলের এক বান্ধবি দিবা শারমীন বৃষ্টিকে ।

PicsArt 09 05 02.19.39

২০১৩ সালে মেহেদির পাশাপাশি হ্যান্ডমেইড হলুদের গহনা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এবং বেইলি রোডে যে কোনো অনুষ্ঠানে স্টল দিতেন। ফলে কাস্টমার সংখা বেড়ে যায় এবং সবার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন আবৃতা খানম।

PicsArt 09 05 02.06.19এই উদ্যোক্তা শুধু মেহেদির ডিজাইন বা হলুদের গহনা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। নাম যেমন দিয়েছেন ইনোভেটিভ টাচ প্লানও ইনোভেটিভ। হলুদের পাশাপাশি তিনি ব্রাইডাল জুয়েলারি, ব্রাইডাল মেকওভার, ওয়েডিং ম্যানেজমেন্ট, ফটোগ্রাফির জন্য ফটোগ্রাফার এমনকি ছোট বেলা থেকেই তিনি নাচ পারতেন, যার ফলে ডান্স কোরিওগ্রাফিও যোগ করে ফেলেন ইনোভেটিভ টাচ-এ।

PicsArt 09 05 02.01.38ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে শুরু যেহেতু করেছেন আবৃতা, তাই তার কিছু লোকের প্রয়োজন হতো। তিনি ছাত্র – ছাত্রীদের কাজে নিতেন। বর্তমানে ৬ জন ছাত্রী স্থায়ী ভাবে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পার্টটাইম হিসেবেও কাজ করেন অনেক ছাত্রী। কাজ ও শিখিয়েছেন বেশ কয়েক জনকে।

ইনোভেটিভ টাচের একটি শাখা বর্তমানে দেশের বাহিরেও (অষ্ট্রেলিয়া) আছে। অষ্ট্রেলিয়াতে ইনোভেটিভ টাচ দেখাশোনা করছেন পার্টনার দিবা শারমীন বৃষ্টি। অষ্ট্রেলিয়াতে এখনো সবকিছু ওপেন হয়নি তবে ভবিষ্যতে হবে বলে জানান আবৃতা। এখন শুধু মেহেদি এবং কিছু জুয়েলারি দিয়ে শুরু করেছেন বলে জানান আবৃতা।

PicsArt 09 05 02.00.35আবৃতার এই সফল হয়ে ওঠার পিছনে আছে বাধার গল্পও। সেই কথা বলতে গিয়ে বলেন, তিনি যখন জুয়েলারি এবং হলুদের গহনা বানানো শুরু করলেন তখন ফরচুন মার্কেটের একটা দোকানে পাইকারি গহনা বিক্রয় করতেন আবৃতা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার কারণে বেশ কিছু দিন দোকানে যোগাযোগ করতে পারেন নি। পরে যখন পেমেন্ট আনতে যান; গিয়ে দেখেন দোকানটা উঠে গিয়েছে। তখন তার প্রায় ৩০ হাজার টাকার মত লোকসান হয়। সে সময় পরিবার থেকেও বলে তোমরা পড়াশোনায় মন দাও। এখনও ছোট আছ; এসব তোমাদের দিয়ে হবে না।

PicsArt 09 05 02.03.46
আরো একটা বাধার কথা বলেন আবৃতা, যেহেতু তিনি মেহেদি আর্টিস্ট তাই তাকে বাসায় গিয়ে মেহেদি পরিয়ে আসতে হয়। মেহেদি নাইট থাকলে রাত ১/২ টা বেজে যায়। তখন পরিবার থেকে বাধা আসতো। প্রতিবন্ধকতা নিয়েই সামনে এগিয়ে গিয়েছে আবৃতা এবং হয়েছেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।

PicsArt 09 05 01.56.38সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। মায়ের একটা বুটিকের ব্যবসা ছিল। অসুস্থতার কারণে ব্যবসাটা আর করা হয়ে ওঠেনি। নতুন করে সেই ব্যবসার হালটাও ধরেছেন আবৃতা । ছোটবেলায় মায়ের কাছেই বিভিন্ন ডিজাইন শিখেন এবং প্রচুর মেহেদি দিতে ভালোবাসতেন আবৃতা। আরো সহযোগিতা পেয়েছেন পার্টনার বৃষ্টির মায়ের কাছ থেকে। অনেক সময় তিনি লাইট নিয়ে বসে থাকতেন। বলতেন তোমরা কাজ কর আমি আছি কোন ভয় নাই। বান্ধবীদের সাপোর্ট তো ছিলোই বলেন আবৃতা।

PicsArt 09 05 02.32.17

ইনোভেটিভ টাচে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকম জুয়েলারি ( হলুদ থেকে ওয়েডিং), মেকওভার আর্টিস্ট, মেহেদি আর্টিস্ট, ফটোগ্রাফার, ওয়েডিং ম্যানেজমেন্ট, ড্যান্স কোরিওগ্রাফার।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আবৃতা বলেন, “ছোট থেকে বড় হতে চাই। যদিও এখন অনেকে চেনে আামাকে। আমি মনে করি ভবিষ্যতে ইনোভেটিভ টাচ মানে আবৃতা এবং আবৃতা মানেই ইনোভেটিভ টাচ এমন একটা পরিচয় হবে। আর আমি চাই আমার সাথে যে সব মহিলা মেম্বার কাজ করবে তাদের আমি ভাল একটা মাসিক বেতন দেব। সেই সাথে সারা বিশ্ব চিনবে ইনোভেটিভ টাচকে।”

PicsArt 09 05 02.33.47বয়সটা কোনো কাজের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। উদ্যোগ এবং পরিশ্রম থাকলে সব কাজেই সফলতা আসে।যেমনটা হয়েছে আবৃতার ক্ষেত্রে! দশম শ্রেণিতে থাকাকালীন উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছেন। এখন তিনি নিজে সব কাজ করতে পারেন না, এতটায় অর্ডার আসে! কিছু অর্ডার ক্যানসেলও  করতে হয় এই উদ্যোক্তাকে। ১০হাজার টাকার পুঁজি এখন কয়েক লাখে এসে দাঁড়িয়েছে।

খাদিজা ইসলাম স্বপ্না

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here