উদ্যোক্তা-বাবলি সরকার ও মেয়ে উর্মি সরকার লোপা

ছানাপোনা, সন্দেশ খাই

উর্মি সরকার লোপা। একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। কাজ করছেন নিজের ডিজাইন করা হ্যান্ড পেইন্টেড বিভিন্ন রকমের পোশাক নিয়ে। এর পাশাপাশি উর্মির মা -বাবলি সরকার কাজ করছেন হাতের তৈরি মজাদার সন্দেশ ,নাড়ু নিয়ে।

উদ্যোক্তা উর্মির জীবনে এতোটুকু আসার পিছনে একমাত্র অবদান তাঁর মায়ের। কারণ মা-ই উর্মিকে সব সময় বিভিন্ন কাজে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন। কারণ মা নিজে যে কাজটি করার সুযোগ পাননি সেটি তাঁর সন্তানকে দিয়ে পূরণ করতে চেয়েছেন। উর্মির মায়ের সব সময় মনে হতো মেয়েরা সব সময় ঘরে বসে না থেকে কিছু করবে, নিজে স্বাবলম্বী হবে এবং এভাবে সামনে এগিয়ে যাবে। তাই উর্মির জীবনে মায়ের প্রভাবটাই সবচাইতে বেশি।

গ্রাজুয়েশন শেষে উর্মির একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি করা শুরু করেন। কিন্তু কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি করে তার মন মান ছিলোনা। আর ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করেও যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন , তখন উর্মির মনের ভেতরে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল। উর্মি ভাবলেন তাকে এমন কিছু করতে হবে যাতে উর্মি নিজে স্বাবলম্বী হতে পারেন এবং নিজেই নিজের পরিচয় সৃষ্টি করতে পারেন। নিজের প্রয়োজনগুলো নিজেই মেটাতে পারেন।

পরবর্তীতে উর্মি ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে ডিপ্লোমা করেন। এত কিছু থাকতে কেন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের কথা মাথায় আসলো। উদ্যোক্তা বলেন ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ড্রইং ও বিভিন্ন রকম ডিজাইনের ড্রেস এর প্রতি আকর্ষণ ছিল প্রবল। আমি দুই কন্যা সন্তানের মা। তাদের বেশিরভাগ জামাকাপড়ই আমার ডিজাইনে করা। তাই আমি ফ্যাশন ডিজাইনিংটাকেই বেছে নিয়েছি মন থেকে।’

উদ্যোক্তা উর্মির পণ্য ডিজাইন ও হ্যান্ড পেইন্টেড বিভিন্ন রকমের পোশাক। তবে প্রত্যেক উদ্যোক্তাদের একটা সিগনেচার আইটেম থাকে। উর্মির সিগনেচার আইটেম হলো বাচ্চাদের টি-শার্ট। উদ্যোক্তা গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইন করে দিয়ে থাকেন ।

উদ্যোক্তা উর্মি ইচ্ছা পোষণ করেন- ‘তাঁর নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক তৈরি করতে এবং এটাকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য এতে বিভিন্ন রকমের হ্যান্ড পেইন্টিং এর কাজ করে এর উৎকর্ষতা বাড়াতে।‘

এই প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা উর্মি বলেন, ‘আমার পোশাকের ক্ষেত্রে যদি বলি তাহলে আমার কাপড়ের কোয়ালিটি অবশ্যই ভালো হতে হবে। এছাড়া পোশাকের ডিজাইন এমন হতে হবে যাতে পোশাক পড়ে সবাই বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য যেন খুব আরামদায়ক হয়। আর দামের ক্ষেত্রে অবশ্যই এমন দাম রাখার চেষ্টা করছি যাতে সকল ধরনের ক্রেতাদের সামর্থের ভিতর থাকে। আর আশা করি এভাবে অবশ্যই ক্রেতারা আমার পণ্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করবে।’

চেনেন ? চেনেন না তো ? ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বালিকাবধু ,যে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার পুতুলের সংসার ছেড়ে নিজের সংসারের সর্বময় বধু হয়ে দক্ষতার সঙ্গে সংসার ধর্ম পালন করেতে শুরু করেছিলেন এবং অভাবের সংসারেও পরম যত্নের সঙ্গে নয়টি সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করেছিলেন। তার আরো একটা শখ ছিল , দুপুরে সংসারের সবার রান্না খাওয়া শেষ হলে মাটির উনুনের নিভু আঁচে রকমারি মিষ্টি ও মুখরোচক খাবার বানানো।

একটা সময় ছিল, যখন বাংলার ঘরে ঘরে এমন আমোদিনীদের দেখা পাওয়া যেত। বাংলা তখনও ‘এপার’ আর ‘ওপার’ এই দুভাগে ভাগ হয়নি। লেখাটা পড়তে পড়তে আপনারও হয়তো আপনাদের বাড়ির আমোদিনীর কথা মনে পড়বে… মানে আপনাদের ঠাকুমা বা দিদিমার কথা।

এবার আমরা আপনাদের আমাদের দেশের এক ঠাকুমা বা দিদিমার কথা বলবো ‘ সন্দেশ খাই ‘-এর স্বত্বাধিকারী উদ্যোক্তা উর্মির মা -বাবলি সরকার কে নিয়ে । উদ্যোক্তা উর্মি বলেন, ‘ সন্দেশের কথা বললে আমার মায়ের কথা বলতে হয় সবার আগে। কারন এর মূল স্বত্বাধিকারী আমার মা। আমি শুধু আমার মা -এর ফেইসবুক পেইজ( সন্দেশ খাই) পরিচালনা করছি।’

এই প্রসঙ্গে উর্মি বলেন , ‘ আমাদের ইনস্টিটিউট (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডিজাইন) এ পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। আমরা কয়েকজন স্টুডেন্ট মিলে আমাদের ব্যাচ থেকে একটা স্টল দেই। সেখানে আমার মায়ের হাতের তৈরি সন্দেশ খুব ভালো বিক্রি হয়েছিল। এরপর থেকেই মায়ের নিজে কিছু করার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। কিন্তু কিভাবে শুরু করতে হবে আমরা বুঝতে পারছিলাম না। ‘

বাবলি সরকার যখন কাজটা শুরু করেন সম্পূর্ণ বিনা পুঁজিতে কাজটা শুরু করেছিলেন। সবার প্রথমে ঘরে থাকা দুধ, চিনি, নারিকেল দিয়ে উদ্যোক্তা বাবলি সরকার সন্দেশের কাজ শুরু করেন। যখন দুই একটা করে অর্ডার আসা শুরু করলো এবং ভালই লাভ হচ্ছে, তখন সন্দেশের লাভের সামান্য টাকা দিয়ে বাচ্চাদের পোশাকের দু একটা কাজ শুরু করেন উদ্যোক্তা উর্মি। উর্মিরও দু-একটা করে অর্ডার আসা শুরু করলো। আর এভাবেই আমি আর আমার মা আমাদের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলাম।

বাবলি সরকার এখন আপাতত নয় ধরনের সন্দেশ, নাড়ু নিয়ে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আরো অনেক আইটেম বাড়ানোর চিন্তা ভাবনাও করছেন।বিশেষত বিজয়া দশমীর পর বাড়িতে আগত আত্মীয়-পরিজনকে নাড়ু, মোয়া, মিষ্টান্ন পরিবেশন করে বাঙালিরা সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

বাবলি সরকার যেসকল সন্দেশ নিয়ে কাজ করছেন এগুলো আসলে হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য, যা যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় বিভিন্ন পূজা-পার্বণে ব্যবহার হয়ে আসছে। বাবলি সরকার এই সন্দেশ গুলোকেই একটু ভিন্ন স্বাদে, ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন।

সন্দেশের ক্ষেত্রে বাবলি সরকার বলেন এর মানের কথা। যেহেতু এটা ঘরে তৈরি খাবার তাই এটি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ও শতভাগ ভাগ নিরাপদ ও খাঁটি। উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ তিন দিনের ভিতরে ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। যেহেতু এটা শুকনো খাবার তাই এগুলোর গুণগত মান অনেকদিন ভালো থাকে। খাবারের স্বাদ আর মান ঠিক থাকলে একজন গ্রাহক অবশ্যই আবার রিপিট গ্রাহক হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস করেন বাবলি সরকার।

পরিশেষে উদ্যোক্তা উর্মি সরকার লোপা বলেন – ‘পোশাকের ক্ষেত্রে আমি আমার ডিজাইন দিয়ে পরিচিত হতে চাচ্ছি। আমার মা এর ক্ষেত্রে অবশ্যই সন্দেশ খাই খাবারের গুণগত মান ও স্বাদ দিয়ে। মূলত আমাদের দুজনের দুটো উদ্যোগ একটি একটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর একটি ছাড়া আরেকটি চিন্তা করা যায় না।

ডেস্ক রিপোর্ট, উদ্যোক্তা বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here