তাহমিনা আক্তার মিনু অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ক্লাসে প্রথম হাতের কাজ শিখেছিলেন। ১৯৯৫ সালে মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে প্রাইড টেক্সটাইল থেকে জলপাই রঙের একটা শাড়ি আর ২০ টাকার সুতো কিনে নিজেই হাতের কাজ তুলে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন। নিজের ভীষণ উৎসাহ আর উদ্দীপনা কাজে লাগিয়ে দেশীয় হস্তশিল্পে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

বিয়ের পর হস্তশিল্পের দিকে খুব বেশি নজর দিতে পারেন নি মিনু। ১৯৯৫ সালে ছেলেকে স্কুলে দেবার পর প্রথম নিজের অবসর সময় বের করেন তিনি। অবসর পেয়েই ২০০ টাকা দিয়ে প্রাইড টেক্সটাইল থেকে জলপাই রঙের একটা শাড়ি আর ২০ টাকার সুতা কিনে নিজেই হাতের কাজ তুললেন মিনু। দ্বিগুণ দামে নিজের হাতে তৈরি করা শাড়িটি ব্যাংকার স্বামীর বন্ধুর স্ত্রীর কাছে বিক্রি করলেন।

‘সম্ভব’ একটি শব্দ শুনলেন নিজেই নিজের কাছে। ভীষণ উৎসাহ এবং উদ্দীপনা নিয়ে মিনু গেলেন মার্কেটে। ২ টি শাড়ি ও ৪০ টাকার সুতা কিনলেন এবং ৯০০ টাকা আয় করে ফেললেন।

মিনু উদ্যোক্তা বার্তাকে বলেন, রাজশাহীর নিরিবিলি শান্ত উপশহরের একজন নারী হয়েও কল্পনার বাইরের শক্তি সঞ্চয় করে ফেললাম। অর্ডার নেবো এবং কাজ করবো, এই প্রত্যয় গ্রহণ করলাম। প্রথম অর্ডারটি দিলেন আমার বড় বোন নাসিমা আক্তার, পাঁচ হাজার টাকার থ্রি পিস ও শাড়ি তৈরির অর্ডার। সফলতা ছোঁয়ার দৃঢ় ইচ্ছে থেকেই মনে প্রাণে এ হস্তশিল্প তৈরি এবং ব্যবসা করবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম।দিন দিন কাজের অর্ডার বাড়তে থাকল। ছোট বোন পারভীন আক্তার এবং নাসিমা আক্তার পুরো বিক্রয় এবং বিপননের দায়িত্ব নিল। আমার পণ্যগুলো গুলশানে ফ্যামেলি মার্ট, জি মার্টে প্রোডাক্ট ডিসপ্লে হলো। ১৯৯৮ সালে লাখ টাকার কাজ পেলাম, দ্রুতই ভালো কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল।

মিনুর কর্ম উদ্যোগ গ্রহণের প্রবল স্পৃহা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন: সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ভাবনাই আমাকে একজন উদ্যোক্তা হবার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সাহস এনে দিয়েছে। আমার চাওয়া ছিলো আমার সন্তানের জন্য ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা।

ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন মিনু, শুধু তাই নয় ছেলের স্কুলের অভিভাবকবৃন্দরা প্রসংশার সাথে কাজের অর্ডার দিতে থাকলেন উদ্যোক্তাকে নানান পণ্য তৈরি করে দেবার জন্য।

মিনু বলেন, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করি নিজের নামে, ‘মিনু বুটিক’। ২০০৫ সালের মধ্যে সপুরা, শাল বাগান, জিন্না নগর, তেরো খাদিয়া, হেতেমখা, তালাইমারি এলাকাগুলোর ২৫০ জন কর্মীকে কাজ দিলাম। অত্যন্ত সুনিঁপুন হাতের কাজে পরিশ্রম বেশি, পারিশ্রমিক বেশি এবং সেই সাথে পণ্যের মূল্য একটু বেশি দিয়ে কিনতে আগ্রহী হন সচেতন এবং ফ্যাশনেবল ক্রেতারা।

শাড়ি, রুচিসম্মত পোষাক, থ্রি পিস, বেড কাভার, কুশন কাভার, পিলো কাভার, সিল্ক কাঁথা স্টিচ, সিল্ক কাটওয়ার্ক, সিল্ক এ্যপলিক, সিল্ক বেড কাভার, সিল্ক শাল, সিল্ক কুশন কাভার এক অসাধারন ভুবন গড়ে তুলতে সমর্থ হলেন আত্মশক্তিতে বলিয়ান, নারী উদ্যোক্তা তাহমিনা মিনু।

২০০৭ এ বিসিকে ১০ কাঠা জায়গা নিলেন কারখানা এবং নিজস্ব একটি শো রুম করবার জন্য। ২০১০ কর্মী সংখ্যা দাঁড়িয়ে গেছে প্রায় ৮০০।

8

মিনু জানান, বিভিন্ন কাজ ঘরে বসেই তুলেন কর্মীরা, শেখান অন্যকে এবং সঠিক সময়ের মধ্যে জমা দেন, বেশ পণ্য প্রস্তুত। গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৫শ জন দাঁড়িয়েছে। পছন্দের ও রুচিশীল নজরকাড়া হাতের কাজের পণ্যগুলো তিনি তৈরি করিয়ে দেন, তা তৈরি করিয়ে নেন তৃণমূলে কর্মীদের দিয়ে, যাদের অর্থনৈতিক ভাবে সবল করে তুলছেন, করছেন কর্মক্ষম এবং অর্থনৈতিক ভাবে হয়ে উঠছে স্বচ্ছল, স্বনির্ভর।

বর্তমানে পায়া, আমচত্ত্বর,নোহাটা,এয়ারপোর্টের সংলগ্ন এলাকা,তানোর, আমরুরা, কাটাখালি, সারদা,বাঘা,চারঘাট, এমন স্থানের গ্রামগুলো থেকে প্রায় প্রতিদিনই নিত্য নতুন কাজের অর্ডার নিতে, কাজ শিখতে এবং কাজ দেখাতে, জমা দিতে আসতে থাকেন কর্মীরা। ১ জন ২ জন করে কর্মী নয় এখন প্রতিটি গ্রামের ১ জন বা ২ জন বা ৫ জন করে লিডার তথা সুপারভাইজার নির্বাচন করে কাজ তুলতে হয় উদ্যোক্তার। সুপারভাইজারের সংখ্যা প্রায় ৮০-৮৫ জন, কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক নারীর।

নিভৃত গ্রামে লেখাপড়া জানা, অল্প শিক্ষিত, শিক্ষার পাঠ জোগানো সম্ভব হয় নি, এমন সব নারীদের কর্মসংস্থান করেছেন উদ্যোক্তা মিনু। প্রতিদিন কাজ করে তারা হচ্ছে স্বাবলম্ব্বী। ৬৪ জেলাতেই আজ পণ্য যাচ্ছে মিনু বুটিক থেকে। হাজার দশেকের ওপর ডিজাইন, কাজ তোলার জন্য প্রায় ৩ হাজারেরও ওপর চুক্তিভিত্তিক কর্মী, প্রোডাক্ট লাইনে প্রায় ৩০টির মতো মূল পণ্য।

রাজশাহী যারা চেনেন সিল্কের জন্য যেমন চান সপুরায়, তেমনি হস্তশিল্পের ভুবন দেখতে হলে তারা চান মিনু বুটিককে। ১৫ জন নিয়মিত কর্মী আজ মিনু বুটিকে, সেই তরুণ উদ্যোক্তা যিনি ২১ বছর আগে একটি সুতির শাড়ি কাজ করেছিলেন নিজের হাতে। শুধু তা নয়, আজ সিল্কের যে শিবগঞ্জে কাজ উঠে তার জন্যই বসেছে আলাদা একটি সিল্কের তাঁত মেশিন। ২২০ টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে ৫০০ স্কয়ারফিটে দেশীয় হস্তশিল্পের পণ্য নিয়ে পরিচালনা করছেন প্রায় ৮০ লাখ টাকার ব্যবসা।

 

 

ডেস্ক রিপোর্ট, উদ্যোক্তা বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here