বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কারগুলো নিয়ে ভাবতে গেলে প্রথম দিকেই আমাদের মাথায় আসে যানবাহন। আদিম কালের স্লেজ গাড়িতে চলা থেকে শুরু করে চাকা আবিষ্কার, ধীরে ধীরে মানুষ হয়েছে গতিময়, একটু একটু করে উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। আর গাড়ি চলার পথকে করেছে দ্রুত, আরামদায়ক।

টয়োটা, ফক্সওয়াগন, বেন্টলি, ল্যাম্বরগিনি, বিএমডব্লিউ, টেসলা, ফোর্ড, পোরশে,অডি, রোলস-রোয়েস, ফিয়াটের মতো অত্যাধুনিক ব্র্যান্ড রাজত্ব করছে বর্তমান পৃথিবীতে। আরো অনেক স্বনামধন্য ব্র‍্যান্ড বাজারে বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। তবে মার্সিডিজ বেন্জ নামটি তাদের পণ্য তো বটেই, তাদের সুদীর্ঘ সফলতার ইতিহাসের জন্যও অন্য সবার থেকে একটু আলাদা স্থান তৈরী করে নিয়েছে অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে।

benj1

আজ আমরা উদ্যোক্তা বার্তায় মার্সিডিজ বেঞ্জ নিয়েই কথা বলব, যার উদ্ভাবনের ইতিহাস, সাফল্যগাথার নেপথ্যের ইতিহাসটা প্রায় গল্পের মতো, যা আপনাকে করবে অনুপ্রাণিত, বিস্মিত!

মার্সিডিজ বেঞ্জকে গত এক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিপক্ষে লড়াই করে টিকে থেকে সাফল্যের শিখরে আরোহন করা ব্র্যান্ড হিসেবেই জানি সবাই। ঠিক যতটা চড়াই উৎড়াই সামলাতে হয়েছে মার্সিডিজকে, আজ ঠিক ততটাই সফল গতলিব ডেইমলার (Gottlieb Daimler) এবং কার্ল বেঞ্জের (Carl Benz) অমর এই সৃষ্টি।

১৮৮০ সালে দুজনই আলাদাভাবে হাইস্পিড ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন। যদিও তখনো তাদের দেখা হয়নি। গতলিব এবং তার বিজনেস পার্টনার উইলহেম মেইব্যাক একসঙ্গে ১৮৮৫ সালে একটি গ্যাসোলিন ইঞ্জিন তৈরি করেন।

আবার অন্যদিকে একই বছর কার্ল বেঞ্জ বাইসাইকেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফোরস্ট্রোক ইঞ্জিন আবিষ্কার এবং উন্নত করেন।

জার্মান পেটেন্ট # ৩৭৪৩৫ যানবাহন ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন নিয়ে আসে। কার্ল বেঞ্জের সফলতার অন্যতম ভাগিদার তার সহধর্মিণী বার্থা। তিনি নিজেই কার্ল বেঞ্জের অনেকগুলো ব্যবসার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন এবং আর্থিকভাবেও সাহায্য করেছিলেন। বার্থা অনবরত কার্লকে বিভিন্নভাবে নতুন করে পেটেন্ট করা যানবাহনের তৈরীতে সাহায্য করেছিলেন।

benj3

ডেইমলার – মোটরন- গেসেলসশাফট (ডিএমজি) ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন গতলিব এবং তার পার্টনার উইলহেম মেইব্যাক। তাদের এই যুগ্ম আবিষ্কার পরে মোটরসাইকেল, বোট বানাতেও ব্যবহার করা হয়। এই নতুন ইঞ্জিনকে শুধু আগের ইঞ্জিনের তুলনায় আকৃতিকেই ছোটই করা হয়নি, শক্তিশালীও করা হয়েছিল। ১৮৮২ সাল পর্যন্ত তারা অটোমোবাইল বিক্রিই করতে থাকেন। সাফল্য পেলেও পরে তারা দুজনেই বিভিন্ন শেয়ার হোল্ডারদের সাথে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং মনোমালিন্যের জন্য ব্যবসা থেকে সরে আসেন।

পরে তারা নিজেরা মত নিজেদের প্রতিষ্ঠান শুরু করেন ১৮৯৪ সালে। ১৯০০ সালে গতলিব ডেইমলার মারা যান। মেইব্যাক ডি এমজি পরিচালনা শুরু করেন একাই। কার্ল বেঞ্জ এবং মেইব্যাকের ডিএমজি কোম্পানি দুটোই আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এর জন্য। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বেঞ্জ এন্ড কাই কোম্পানি এবং ডিএমজি কোম্পানি তাদের মিউচুয়াল ইন্টারেস্ট ঠিক রাখতে ১৯২৪ সালে একটি চুক্তি করে যেটা ২০০০ সাল পর্যন্ত বহাল থাকে।

দুই কোম্পানি ১৯২৬ সালে সিধান্ত নেয় “টোটাল মার্জার” কমপ্লিট করার এবং ডেইমলার- বেঞ্জ কোম্পানির জন্ম হয়, আসলে জন্ম হয় এক ইতিহাসের, পরে তাদের কোম্পানি “মার্সিডিজ বেঞ্জ” নামে আত্মপ্রকাশ করে।

benjj

মার্সিডিজ বেন্জ মানেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।তাদের এই চিন্তাধারাই ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, এই একবিংশ শতাব্দিতেও তাদের সাফল্য ধরে রেখেছে। তাদের অসংখ্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে যে ৩ টির কথা না বললেই নয়,

১. ডেইমলার বেঞ্জ সিএফসিবিহীন যানবাহন তৈরি শুরু করে সর্বপ্রথম। তারা বুঝতে পেরেছিল সিএফসি গ্যাস ড্রাইভার এবং পরিবেশ দুইটার জন্যই ক্ষতিকর।

২. দি কনট্রোল এরিয়া নেটওয়ার্ক (The Control Area Network) এমন একটি যোগাযোগ মাধ্যম যেটি সমস্ত সিস্টেমকে একটি গাড়িতেই একজায়গায় করে যেন সর্বোচ্চ দক্ষতায় পরিচালনা করতে পারে। ১৯৯২ সালে প্রযুক্তিটি তাদের যানিবাহনে ব্যবহার শুরু করে। এই প্রযুক্তি সৃষ্টি করে বশ (Bosch) তাদের শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু অন্য কেউ চিন্তা করার আগেই ডেইমলার বেঞ্জ ব্যবহার করতে শুরু করে।

৩. ১৯৯০ সালে সিমেন্স কোম্পানির তৈরি দ্য স্মার্ট কী সিস্টেম(The Smart Key System) এখন অনেক চালকই ব্যবহার করে থাকে, সর্বপ্রথম ডেইমলার বেঞ্জ তাদের গাড়িতে ব্যবহার করে সবার সাথে পরিচিত করে ১৯৯৮ সালে। ডেইমলার বেঞ্জ তাদের চাবিবিহীন প্রবেশ প্রযুক্তির জন্য ১৯৯৭ সালে পুরষ্কৃতও হয়।

banje

ডেইমলার বেঞ্জ গত শতাব্দিতে অনেক পরিবর্তন দেখে আসছে। ২০০৭ সাল থেকে কোম্পানিটি পরিবর্তিত নাম ডেইমলার এজি(Deimler AG) নামে পরিচিত হয়ে আসছে।

কালের বিবর্তনে কোম্পানিটি পরিবর্তনের ইতিহাসে নতুন নতুন ধারা সৃষ্টি করে আসছে। আজও মার্সিডিজ -বেঞ্জ অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি এবং সর্বোচ্চ বিলাসবহুলতার জন্য সারাবিশ্বে সুপরিচিত এবং স্বনামধন্য।

(তথ্যসূত্র ও ছবি ইন্টারনেট থেকে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here