উদ্যোক্তা মোঃ রমিজ মল্লিক

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে উদ্যোক্তা তৈরিতে মূলধারায় ব্যাপক আকারে কোন উদ্যোগ নেই এখন পর্যন্ত। যদিও কোন ধরনের মানুষই থেমে নেই। অনেকেই নিজেদের মত করে ক্ষুদ্র অথবা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তারা যেন আরো সক্রিয়ভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উদ্যোক্তা মোঃ রমিজ মল্লিক এবং তার স্ত্রী সাথী আক্তার।

romij1
উদ্যোক্তা মোঃ রমিজ মল্লিক এবং তার স্ত্রী সাথী আক্তার

টেইলারের কাটার মাস্টার মো: রমিজ মল্লিক শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তিনি আজ একজন উদ্যোক্তা। তিনি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। জন্মের সময় মায়ের গর্ভ থেকে ডাক্তার পা ধরে বের করেছিলেন। মায়ের গর্ভে উল্টিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই মূলত তার এই কষ্টের গল্প শুরু হয়। ডাক্তাররা এভাবে মায়ের গর্ভ থেকে বের করার জন্য পায়ের রগ চিকন হয়ে যায়। অনেক চিকিৎসা করার পরেও তিনি ভাল হয়ে উঠেননি। এই কষ্ট বুকে নিয়েই তিনি জীবনের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

romij2

উদ্যোক্তা বলেন, ‘ঝালকাঠি জেলা সদরে একটি দোকানে কাজ নিয়েছিলাম। সেখান থেকেই প্রশিক্ষণ নেওয়া। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ভৈরবপাশা ইউনিয়নে একটি টেইলার্সের দোকান দিয়েছিলাম একজন কর্মচারী নিয়ে। ওই দোকান ভালো চলতো না। এরপর অনেক ঋণ নিয়েছিলাম। যা বাবা-মা মিলে শোধ করেছিল। সেই ঋণ নিজে শোধ করতে পারছিলাম না বলে স্ত্রী পরামর্শ দেয় চলো ঢাকায় যাই আমরা। পরে আমার স্ত্রী সাথী আক্তারের অনুপ্রেরণায় সেখান থেকে সেলাই মেশিন চারটি নিয়ে শহরে চলে আসি। মাত্র দুটি পা চালিত সেলাই মেশিন ও একটি পা চালিত ওভার লক মেশিন দিয়েই বর্তমানে প্যারাডাইস টেইলার্সে চলছে পোশাক তৈরির কাজ’।

ঈদকে সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। যেহেতু প্যানডেমিমের সময় চলছে, তাই অনেক অসুবিধার মধ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান উদ্যোক্তা দম্পতি। টেইলার্সটিতে এখন চলছে সালোয়ার, কামিজ, থ্রিপিস, ব্লাউজসহ নারীদের বাহারি রঙ ও ডিজাইনের পোশাক তৈরির কাজ। রুগ্ন পা দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন সেলাই মেশিন। মনের জোর আর স্বাবলম্বী হবার ঐকান্তিক ইচ্ছাকে পুঁজি করেই কর্মযজ্ঞে নেমেছে প্রতিবন্ধী এই মানুষটি।

romikjk

উদ্যোক্তা রমিজ মল্লিক এবং তার স্ত্রী সাথী আক্তার জানান, বিবাহ করেন বাবা-মার অমতে। সেজন্য কোন সহযোগিতা ছাড়াই দু’জন মিলে দিনের পর দিন একে অপরকে সাহায্য করে যাচ্ছেন এ ব্যবসায়। ঢাকায় আসার পরে স্বামী-স্ত্রী দুজন উদ্যোক্তা মিলে দোকানে দোকানে কাজ করেন। কিছু দিন পরে একটি দোকানে মাস্টার হিসেবে চাকরি নেন উদ্যোক্তা। সেখান থেকেই জীবন শুরু করেছিলেন। সে মাস্টারি করতে করতে মিরপুর-১০ নম্বরে একটি মার্কেটের দোকানে টেবিল ভাড়া নেন। সেই টেবিলে বসে কাজ করেন বহুদিন। এরপর যেখানে মাস্টারি করতেন সেই “প্যারাডাইস” নামক দোকানটি নিজেই ভাড়া নিয়ে মালিক হয়ে পরিচালনা করেন। এখন দু’জন অসহায় নারীকেও নিয়েছেন সহকর্মী হিসেবে।

তিনি আরও জানান, এরপর পড়ে যায় প্যানডেমিকের সময়, যাতে খুব ক্ষতিগ্রস্ত হন উদ্যোক্তা। আল্লাহর ওপর ভরসা করে কিছু একটা করার পরিকল্পনা খুঁজতে থাকেন। সমিতি থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে আবার শুরু করেন একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেজ যার নাম দিয়েছেন ‘চাঁদনী ক্লোথিং শপ’। যা খুব ভালই চলছিল করোনাকালীন।

romijjj

উদ্যোক্তা রমিজ মল্লিক এবং তার স্ত্রী জানান, আবার প্যানডেমিকের পরিস্থিতি হওয়াতে অনেক বিপদগ্রস্ত হতে হচ্ছে। যার জন্য বাড়ি ছেড়ে দিতে এবং অনেক নিম্ন স্থানে নেমে যেতে হয়েছে। প্রায় মাসে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয় এবং দু’জন কর্মচারীকেও চালাতে হয়। তাই পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে গেছে বলে দু’জনে কেঁদে ফেলেন।

রমিজ মল্লিক বলেন, ‘পারি না’ শব্দটি শুনতে পারি না। কেউ যদি পাশে থেকে বলে কোন একটি ‘কাজ করতে পারব না’ তাহলে মনের ভেতর রাগ পুষে তুলি। জীবনে মানুষ পারেনা এমন কিছুই নেই। তাই পারতে হবে এবং এগোতে হবে। নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে এটাই পরিকল্পনা এবং স্বপ্ন’।

নিজেকে মূলধারায় সম্পৃক্ত রাখতে রোজগারের পাশাপাশি অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও স্বাবলম্বী করে তুলতে সেলাই প্রশিক্ষণ দিতে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগী ক’জন নিতে পারে? যারা সুস্থ সবল হয়েও কর্মহীন ও উপার্জন বিমুখ এই উদ্যোগ তাদের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।

মেহনাজ খান
উদ্যোক্তা বার্তা, ঢাকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here