কাটিং মাস্টার থেকে সফল টেইলারিং উদ্যোক্তা সিদ্দিক মন্ডল

0

নিজের কিছু একটা করতে হবে এবং অর্থনৈতিকভাবে ভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে এমনটি উপলব্ধি করলেন ফরিদপুরের কিশোর সিদ্দিক মন্ডল। পড়াশোনা তেমন একটা টানতনা কিশোর সিদ্দিককে। হাতে কলমে কাজ শিখে কাজ করতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে নিজে স্বাবলম্বী হওয়া যাবে এই চিন্তা করেই ড্রাইভিং এবং মেকানিকের কাজ শিখার আগ্রহ নিজের মধ্যে পোষণ করতেন কিশোর সিদ্দিক।

বাবা জলিল মন্ডল যখন জানতে পারলেন ছেলের এমন ইচ্ছের কথা তখন বাবা বললেন, পাঁচ ভাই দুই বোন পড়াশোনা করে যখন অনেক বড় হয়ে যাবে তখন তুই তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবিনা। কথাটা ভীষণভাবে নাড়া দেয় সিদ্দিক মন্ডলকে। এমন সময় বড় ভাই মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর মন্ডল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢুকে পড়লেন শিক্ষকতা পেশায়।

সিদ্দিক মন্ডল তখন আরও অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন। নিজে অন্যরকম কিছু একটা করে স্বাবলম্বী হবার এবং নিজের পরিবারের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবার। তিনি চান কিছু একটা করে নিজে স্বাবলম্বী হবার জন্য কিন্তু পরিবার সবসময় বলে পড়াশোনা করার জন্য। এমনই সব বিষয় নিয়ে ভাই বোনের সাথে মনমালিন্যের জের ধরে কাউকে কিছু না বলে ঢাকার পথে পাড়ি জমালেন কিশোর। মিরপুরে চাচাতো ভাইয়ের ট্রেইলারের কাজ। তার কাছেই গেলেন তিনি। বাবার কথা বারবারই মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে কিশোরের মনে। সিদ্ধান্ত নিলেন এমন একটি কাজ হাতে কলমে শিখে নেবেন যা সকলের বেশি প্রয়োজন এবং যে কাজ দিয়ে পৌঁছানো যাবে সমাজের যে কোন স্তরের মানুষের কাছে। সেই চিন্তা থেকেই ভাইয়ের কাছে হাতে খড়ি।

siddique3

দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিবারের বড় ভাই আসেন ঢাকাতে এবং সাথে করে নিয়ে গেলেন আবারও ফরিদপুরে। বাবা সবচেয়ে বড় দর্শনটি ছেলেকে উপহার দিলেন। বাবা বললেন, যেহেতু ট্রেইলারিংয়ে তোমার আগ্রহ তাহলে তোমাকে একটি উপদেশ দিই। তা হল তোমাকে দেশের সেরা জায়গায় দেখতে চাই। তিনি বাবাকে কথা দিলেন টেইলারিংয়ের যে উৎকর্ষতা বা সর্বোচ্চ যে লেভেল আছে নিজের কাজের মাধ্যমে পৌঁছাবেন সেখানে।

ঢাকায় ফিরে গিয়ে ৬ মাস ফুল ট্রেনিং নিলেন তিনি।কাজ শিখে বাড়িতে গেলেন তরুণ সিদ্দিক। যত সেলাই তত্ত্ব উপার্জন। নিজের প্রথম উপার্জন ছিল ৫০০ টাকা। বাবার হাতে তুলে দিলেন কিশোর থেকে তরুণ হয়ে ওঠা সিদ্দিক।

এরপর বুক ভরা স্বপ্ন, আশা আর সাহস নিয়ে ঢাকার পথে পাড়ি জমালেন সিদ্দিক। নব্বইয়ের দশক! ঢাকাতে কাজ খুঁজলেন তরুণ কিন্তু কাজ পেলেন না। মগবাজারের লাবনী টেইলার্সে প্রথম টেইলার মাস্টার হিসেবে কাজে যোগ দিলেন। শার্ট-প্যান্ট, সাফারির কাজ করতেন সিদ্দিক। বন্ধুর কাকা পরামর্শ দিলেন, কোট, সুট কাটিং শিখার জন্য। সারা সপ্তাহ হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে শুক্রবার ছুটির দিনটি তরুণ কাটিং মাস্টার নিবিরভাবে নিরীক্ষণ করতে থাকেন এবং শিখে নিতে থাকেন হাতে কলমে অফিস, কর্পোরেট ব্যক্তিদের আউটফিটের মোস্ট স্ট্রাকচার কাটিং।

সিনেমা দেখতে ভালোবাসা তরুণ শিখে নেন নায়কদের কোন কোটে কেমন ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠে, কোন স্যুট এর সাথে কি কালার টাই পড়লে কেমন দেখায়; রুপালি পর্দায় কিম্বা ম্যাগাজিনে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতেন তিনি এবং শিখে নিতেন নিজের কাজ। হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ থেকে জার্মানির একজন গেস্ট একটা কমপ্লিট সেট বানানোর জন্য অর্ডার দিলেন। ফোনে অর্ডার দিলেন পুরো সেট বানানোর জন্য। বিদেশি একজন অতিথির কাছে যখন কাজ বুঝিয়ে দিলেন তখনই এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করলেন তিনি। এরপরেই নতুন অফার আসলো তার কাছে। কোট বানানোর ফ্যাক্টরি “বেস্ট শোরুম” তরুণ সিদ্দিককে কোট কাটিং মাস্টার এর জব দিলেন। বনিবনা না হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিলেন তরুণ।

siddique4

সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই উদ্যোক্তা হবেন। ছেলের উদ্যোগের কথা জেনে বাবা বাড়ি থেকে ২৫০০০ টাকা উপহার দিলেন। বাবার উপহার আর আশীর্বাদ যেন ছেলেকে আরো শতগুণ আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে। একজন দুজন করে কাস্টমার আসতে আসতে শতজন কাস্টমার ছাড়িয়ে যায় একসময়। তিন বছরেই দুটি শোরুম নিয়ে নিলেন সিদ্দিক মণ্ডল। ১৯৯৯ সালে মগবাজার প্লাজায় ৫০০স্কয়ার ফিটে সিদ্দিক টেইলার্স নামের সিগনেচার শোরুম দিলেন সিদ্দিক মন্ডল।

বন্ধুদের পরামর্শ আর ভালোবাসায় প্রতিষ্ঠিত হল নিজের ভালবাসার স্বপ্ন শোরুম এবং একটি ট্রেইলর। এরপর এক এক করে আসতে থাকে সুটের অর্ডার, কোর্টের অর্ডার। বিভিন্ন ডিজাইনের কাজ গুলো নিয়ে ঠিক সেই ভাবেই বানিয়ে দিয়ে কাস্টমারদের ভীষণ সন্তুষ্ট করতে থাকলেন ট্রেইলর উদ্যোক্তা ডিজাইনের উদ্যোক্তা সিদ্দিক মন্ডল।

বিভিন্ন ডিজাইনের অর্ডার আসতে থাকে।দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় পণ্য ডেলিভারি করতে থাকেন তিনি। বিভিন্ন উৎসব কিংবা বিয়ের জন্য আসা শেরওয়ানির অর্ডার নিমিষেই বানিয়ে ফেলেন উদ্যোক্তা সিদ্দিক মন্ডল। বিভিন্ন ধরনের প্যান্ট বানিয়েও ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করলেন তিনি। যেকোনো ধরনের শাটের অর্ডারিই হোক না কেন বানিয়ে ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করে ফেলেন তিনি। এক এক করে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। মাত্র বিশ বছরেই গড়ে তুললেন ব্র্যান্ড টেইলার সিদ্দিক টেলারস এন্ড ফেব্রিক্স। হাজার হাজার কাস্টমারের, যেকোনো ডিজাইনের, যেকোনো মেন্স আউটফিট ভীষণ দ্রুত, পছন্দের কিংবা মাপের, কম মজুরিতে বানিয়ে কাস্টমারের মন জয় করে ফেললেন সিদ্দিক টেইলারস এন্ড ফেব্রিক্স।

স্কুল পড়ুয়া এক কিশোর কিছু করতে চেয়ে দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে, একজন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। হয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন। নিজের হাতে কলমে কাজ শিখে এগিয়েছেন। উদ্যোগী হয়ে পৌঁছে গেছেন নিজের স্বপ্নের কাঙ্খিত ভুবনে। একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। সমাজের অনেক নামিদামি ব্যক্তি বর্গের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। কাস্টমাইজড ডিজাইন থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডিজাইন সকল ধরনের ডিজাইন চোখের পলকে করে ফেলে নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন সফল আত্মকর্মী বলিয়ান উদ্যোক্তার টেইলর হিসেবে। নিজের কর্মস্পৃহা এবং পরিশ্রম দিয়ে পরিচালনা করছেন কোটি টাকা মূল্যমানের ব্যবসা।

মার্জিয়া মৌ,
উদ্যোক্তা বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here