মার্কিন বিজনেস ম্যাগনেট, উদ্যোক্তা এবং সমাজকর্মী-ওয়ারেন বাফেট

এক সময় মুদি দোকানে কাজ করতেন। ছিলেন হকার। ছোটবেলায় চুইংগাম, কোকাকোলার বোতল, এমনকি সংবাদপত্রও বিক্রি করতেন। তাকে বিংশ শতকের সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখন দুনিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী। একজন মার্কিন বিজনেস ম্যাগনেট, উদ্যোক্তা এবং সমাজকর্মী। বর্তমানে ৬৩টি কোম্পানির মালিক। এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার দান করেছেন বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায়। তারপরও তিনি ৪ হাজার কোটি ডলারের মালিক। এখন তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনেক বিশেষণ।

১৯৩০ সালের ৩০শে আগস্ট নেবরাসকা’র ওমাহা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য ব্যক্তি। তার পিতার নাম হাওয়ার্ড বাফেট এবং মায়ের নাম লিলা বাফেট। ওয়ারেন হলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। রোজ হিল এলিমেন্টারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৪২ সালে বাফেটের বাবা কংগ্রেসে নির্বাচিত হলে সপরিবারে ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে যান। এরপর তিনি পড়াশোনা করেন ওয়াশিংটনের উডরো উইলসন হাই স্কুলে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি জমা দেন আয়কর রিটার্ন। সেখানে তিনি নিজেকে সংবাদপত্র বিলিকারী হিসেবে পরিচয় দেন

uddoktabarta 10
শৈশবে ওয়ারেন বাফেট

১৯৪৫ সালে তিনি হাই স্কুলে থাকতেই এক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবহার করা একটি পিনবল মেশিন কেনেন মাত্র ২৫ ডলারে। মেশিনটি বসানোর মতো জায়গা ছিল না তাদের। এক নাপিতের দোকানের ভেতরে তা বসিয়ে দিলেন। এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তারা বিভিন্ন স্থানে বসালেন একই রকম তিনটি মেশিন। এভাবেই তার ব্যবসায় যাত্রা শুরু। তিনি ১৯৫০ সালে ইউনিভার্সিটি অব নেবরাসকা থেকে অর্থনীতিতে অর্জন করেন বিএস ডিগ্রি। ১৯৫১ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে এমএস। ১৯৫১ থেকে ’৫৪ পর্যন্ত বাফেট-ফক অ্যান্ড কো.-তে ইনভেস্টম্যান সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেন। জীবন যাপন করেন অতি সাধারণ মানের।

ওয়ারেন বাফেট ১৯৫২ সালে বিয়ে করেন সুসান থম্পসনকে। তাদের রয়েছে তিন সন্তান- সুসান বাফেট, হাওয়ার্ড গ্রাহাম বাফেট এবং পিটার বাফেট। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে স্ত্রী সুসান মারা যান। এর আগে ১৯৭৭ সাল থেকে তাদের বিচ্ছেদ না ঘটলেও তারা আলাদা বসবাস করতেন। তাদের মেয়ে সুসান ও মাহাতে বসবাস করেন। ১৯৫৮ সালে বিয়ের পরে ৩ বেডরুমের যে বাড়িটি কিনেছিলেন এখনও সেখানেই বাস করছেন।তিনি বলেন, আমার যা কিছু দরকার তার সবই আছে এখানে। বিশ্বের এত বড় ধনী, তার বাসার চারদিকে নেই কোন বেড়া বা সীমানা প্রাচীর। এ বিষয়ে তার পরামর্শ হলো- প্রকৃতপক্ষে আপনার যতটুকু দরকার তার বেশি কিছু কিনবেন না। আপনার সন্তানদেরও এমনটা ভাবতে ও করতে শেখান। নিজের গাড়ি তিনি নিজেই চালান। তার আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেট কোম্পানি। কিন্তু ভ্রমণ করেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে ইকোনমিক ক্লাসে। অনেকেই ভাবতে পারেন, এটা অসম্ভব। কিন্তু তিনি তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

সম্প্রতি তিনি সিএনবিসি-কে এক ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন জীবনের উত্থান কাহিনী। তার মতে, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য নিজেকে আগে স্থির করতে হয় তার লক্ষ্য। তিনি এমনই এক লক্ষ্য নিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সেই প্রথম শেয়ার কিনেছিলেন। তারপরও তিনি মনে করেন, ব্যবসায় আসতে তার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরও আগে ব্যবসা শুরু করা উচিৎ। সংবাদপত্র বিক্রি করা অর্থ দিয়ে তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ছোট্ট একটি ফার্ম কেনেন। অল্প অল্প করে জমানো অর্থ দিয়ে যে কেউ কিনতে পারেন অনেক কিছু। সেজন্য সন্তানদের তিনি কোন না কোন ব্যবসায় নিয়োজিত করার পরামর্শ দেন।

uddoktabarta4 14
বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ওয়ারেন বাফেট

নিউইয়র্কে গ্রাহাম-নিউম্যান কর্পোরেশন সিকিউরিটি এনালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৫৪ থেকে ’৫৬ পর্যন্ত। এছাড়া তিনি বাফেট পার্টনারশিপ লি., বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ইনস্যুরেন্সসহ বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করেছেন। এর বেশির ভাগই তার নিজের। ১৯৬২ সালে তিনি পরিণত হন মিলিওনিয়ারে। বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে হলো একটি টেক্সটাইল কারখানা। এখানকার প্রতিটি শেয়ার তিনি ৭.৬০ ডলারে জনগণের মাঝে ছেড়ে দেন। এক পর্যায়ে ১৯৬৫ সালে প্রতি শেয়ারের বিপরীতে কোম্পানি ১৪.৮৬ ডলার দেয়। এর মধ্যে ফ্যাক্টরি এবং সরঞ্জাম দেখানো হয়নি। এরপর তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেন চেস-এর নাম ঘোষণা করেন। ১৯৭০ সালে তিনি শেয়ার হোল্ডারদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত চিঠি লেখা শুরু করেন। শেয়ার হোল্ডারদের কাছে এ চিঠি ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। এ সময়ে বেতন হিসেবে তিনি বছরে পেতেন ৫০ হাজার ডলার। ১৯৭৯ সালে তার বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে প্রতি শেয়ারের জন্য ৭৭৫ ডলার দিয়ে ব্যবসা করতে থাকে। এই শেয়ারের দাম ১৩১০ ডলার পর্যন্ত ওঠে। এ সময়ে তার নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ কোটি ডলার। এর ফলে ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রথমবারের জন্য তিনি ফোর্বস ৪০০-তে স্থান পান।

২০০৬ সালের জুনে তিনি ঘোষণা দেন যে, তিনি বার্কশায়ার হোল্ডিংয়ের শতকরা ৮৫ ভাগ বার্ষিক উপহার হিসেবে পাঁচটি ফাউন্ডেশনে দিয়ে দেবেন এবং তা শুরু হবে জুলাই থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ দেয়া হয় বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনকে। ২০০৭ সালে তিনি শেয়ার হোল্ডারদের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে জানান, শিগগিরই তিনি একজন তরুন উত্তরসূরি নিয়োগ দিতে লোক খুঁজছেন। ২০০৮ সালে তিনি বিল গেটসকে হটিয়ে নিজে হন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী। ফোর্বসের মতে, তখন তার সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার। তবে ইয়াহু’র মতে তার তখনকার সম্পদের পরিমাণ ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। এর আগে পরপর ১৩ বছর ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাবে বিশ্বের এক নম্বর ধনী ছিলেন বিল গেটস। এরপর ২০০৯ সালে গেটস তার শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেন। দ্বিতীয় স্থানে চলে আসেন ওয়ারেন বাফেট। ২০০৮ থেকে ২০০৯ অর্থবছরে ওয়ারেন বাফেট লোকসান করেছেন ১২০০ কোটি ডলার।

uddoktabarta2 19
বিশ্বের দুই শীর্ষ ধনী বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফেট

তিনি খুব ভাল তাস খেলতে জানেন। শ্যারন ওসবার্গ ও বিল গেটসের সঙ্গে তাস খেলতেন। সপ্তাহে ১২ ঘণ্টা কাটে তার তাস খেলে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে খবর প্রকাশিত হয় যে, ওয়ারেন কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাছাড়া তার ডেস্কে নেই কোন কম্পিউটার। তার কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে এখন ৬৩টি কোম্পানির মালিক। এসব কোম্পানির প্রধান নির্বাহী অফিসারকে তিনি বছরে মাত্র একটি চিঠি লেখেন। তাতে সারা বছরের কর্মকৌশল বলে দেয়া থাকে। নিয়মিত তাদেরকে নিয়ে তিনি মিটিং করেন না। এজন্য তার পরামর্শ হলো- ঠিক জায়গায় ঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করুন। অর্থাৎ ঠিক জায়গায় ঠিক ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হলে তাকে কাজের কথা বলে দিতে হয় না। ওয়ারেন বাফেট তার নির্বাহীদের দু’টি মাত্র নিয়ম বলে দিয়েছেন। তার প্রথমটি হলো- শেয়ার হোল্ডারদের অর্থ নষ্ট করো না। দ্বিতীয় নিয়মটি হলো- প্রথম নিয়মকে ভুলে যাবে না। লক্ষ্য স্থির করো এবং সেদিকে লোকের দৃষ্টি কাড়তে চেষ্টা করো।

তার জীবনধারাকে স্পর্শ করেনি সমাজের উচ্চশ্রেণীর সামাজিকতা। তিনি নিজেই নিজের খাবার তৈরি করেন। কিছু পপকর্ন নিজেই প্রস্তুত করে খান এবং বাসায় বসে টেলিভিশন দেখেন। তার সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বিল গেটসের পরিচয় হয় মাত্র ৫ বছর আগে। তখনও বিল গেটস জানতেন না যে, ওয়ারেনের সঙ্গে তার অনেকটাই মিল আছে। ফলে মাত্র আধা ঘণ্টা পর তিনি ওয়ারেনের সঙ্গে দেখা করেন। যখন ওয়ারেনের সঙ্গে তার দেখা হয় তা স্থায়ী হয়েছিল দশ ঘণ্টা। এর পর থেকেই তার ভক্ত হয়ে যান বিল গেটস।

বিপুল ধনসম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ওয়ারেন বাফেট অত্যন্ত মিতব্যয়ী। একজন প্রখ্যাত জনহিতৈষী ব্যক্তি। তিনি তার সম্পদের ৯৯ ভাগ জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য দান করবেন বলে অংগীকার করেছেন। ২০১২ সালে তার প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে।

 

(তথ্যসূত্র ও ছবি ইন্টারনেট থেকে)

জান্নাতুল ফেরদৌস তিথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here