Advertisement

সাদিয়া সূচনাঃ আত্মহত্যা করবার আগ মুহুর্তে নিজের জীবনটাকে আরো একবার যাচাই করে নেওয়া যাক! সাধারণত ব্যর্থতা, জীবনের টানাপোড়েন, আর্থিক দৈনতা, মানসিক সংকট থেকে আত্মহত্যার চিন্তা মানবসমাজে নতুন নয়, বেশ পুরনো। কিন্তু ঠিক আত্মহত্যার পূর্বমূহুর্তে জীবনের হিসেবটা আরো একবার দারুনভাবে মিলিয়ে সফল হতে পারে ক’জন? তাও শুধুমাত্র সাধারণ কোনো সফলতা নয়! যদি পাওয়া যায় বিশ্বের সেরাদের তালিকায় নাম? এও কি সম্ভব?

বাবা উইলবার ডেভিড এবং মা মার্গারেট এন এর তিন সন্তানের মধ্যে জেষ্ঠ্য সন্তান হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। জন্ম ১৮৯০ সালে।

উদ্যোমী এক যুবক হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স, যার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রতিভাত সফলতার অন্বেষণ

মাত্র ৫ বছর বয়সে (১৮৯৫ সালে) পৃথিবীতে তাদের পরিবারকে একা রেখে পরপারে চলে যান তার বাবা। বাবার মৃত্যুর পর মা মার্গারেটের কাঁধে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পরে। মা মার্গারেট দিনরাত পরিশ্রম করে সংসারের অন্ন জোগাড় করতেন। অভাবের সংসারে কাজের খাতিরে যে দীর্ঘ সময় মা মার্গারেট বাইরে থাকতেন তার পুরোটা সময় ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা এবং খাওয়ানোর দায়িত্ব থাকতো বড় ভাই স্যান্ডার্সের। ৭ বছর বয়সে বড় ভাই স্যান্ডার্স রাতারাতি শিখে গেলেন রুটি, সবজি বানানো। শুধু তাই নয়! দক্ষতা আরো পোক্ত হল মাংস রান্নায়। মা কাজ করেন বাইরে আর ভাই বোনদের ঘরে সামলে রাখেন স্যান্ডার্স। বাবার মৃত্যুর পর এভাবে সংসারের অভাব অনটনকে জয় করে সময়টা খারাপ ছিল না তাদের।

১৯০২ সালে মা মার্গারেট, উইলিয়াম নামের এক যুবকের সাথে দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ের পিড়িতে বসেন। সে সময় তাদের পরিবার ইন্ডিয়ানার গ্রিনউডে চলে আসে। দ্বিতীয় বাবার সাথে কিছুতেই বনিবনা হচ্ছিল না সদ্য কিশোর স্যান্ডার্সের। ১৩ বছর বয়সে তিনি ঝরে পড়েন তার স্কুলজীবন থেকে এবং এরপর পরিবারকে চিরদিনের মত বিদায় জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসে ঘোড়ার গাড়ী রং করার চাকুরী নেন। সেখানেও খুব বেশিদিন টেকেননি স্যান্ডার্স। ১৪ বছর বয়সে দক্ষিন ইন্ডিয়ানায় ফার্মহ্যান্ড হিসেবে কাজ করেন বছরখানেক।

Advertisement
১৮৯৭ সালে মা মার্গারেট এর সাথে ৭বছরের হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স

এরই মাঝে নিজের বয়স নিয়ে কারচুপি করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতেও চাকুরী করেছেন তিনি। তবে সেখানেও কর্মস্থল পরিবর্তন করতে সময় লাগেনি তার। বছর না ঘুরতেই এই চাকুরীও ছেড়েছেন বুক ফুলিয়ে। সেখানে তার কর্মজীবন ছিল ১৯০৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। ১৭ বছর বয়সে পরপর ৪টি চাকুরী থেকে তিনি বিতারিত হোন।

১৮ বছর বয়সে ছন্নছাড়া জীবনকে গুছিয়ে নিতে বৈবাহিক জীবন শুরু করেন জোসেফাইন কিং এর সাথে এবং রেলওয়ে কন্ডাকটর হিসেবে পেশায় নিযুক্ত হোন। জোসেফাইন এবং স্যান্ডার্সের সংসারে  একটি পুত্র ও দু’টি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের হলেও সত্যি মাত্র ১৯৩২ সালে তাদের পুত্র জুনিয়র হ্যারল্যান্ড টনসিল ইনফেকশনে মারা যায়। এক সময় দুই কন্যাকে নিয়ে তার স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে। মাঝে ১৯১৬ সালের দিকে তিনি একবার তার মায়ের কাছে ফিরে যান। পেনসিলভেনিয়ায় দিনমজুর হিসেবেও কাজ করেন সেখানে।

তার জীবনবৃত্তান্তের পরবর্তীতে জানা যায় তিনি রেলওয়ের অগ্নিনির্বাপক হিসেবে দিনে কাজ করার পাশাপাশি রাতে লা স্যালে এক্সটেনশন ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে সান্ধ্যকালীন পড়াশুনা শুরু করেন। কিন্তু হায়! ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রেলওয়ে সহকর্মীদের সাথে কেবলমাত্র উচ্চসরে ঝগড়া করার অভিযোগে রেলওয়ের চাকুরীটা চলে গেল। এরপর পরপর কয়েকটি লাইফ ইনস্যুরেন্স এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবেও কাজ করেন। কোনো কাজেই খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারেননি।

১৯২০ সালে তিনি ফেরী নৌকার কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন যার কিছু শেয়ার তিনি নিজের নামে রাখেন। সেই কোম্পানীকে চালিয়ে নিতে ফান্ড পেতে তাকে বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়। সে সময় তিনি কোম্পানির সেক্রেটারি নিযুক্ত হোন। সেই কোম্পানির সফলতা ছিল ম্যাজিকাল। ফান্ডিং এর সফলতার পর কলম্বাস, ইন্ডিয়ানার চেম্বার অব কমার্সে তিনি সেক্রেটারি হিসেবে জয়েন করেন। কিন্তু সেখানে তিনি যোগ্য নন দাবি করে, এখান থেকেও অব্যাহতি নেন কয়েকদিনের মাথায়।

১৯২৪ সালে কেন্টাকির উইনচেস্টারে চলে আসেন স্যান্ডার্স। “মিকেলাইন টায়ার কোম্পানি” তে সেলসম্যান হিসেবে চাকুরী নেন এবার। কিন্তু সেই কোম্পানি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় “স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল অব কেন্টাকি” র ম্যানেজারের সাথে তার দেখা হয়। যিনি নিকোলাসভিলে তাকে একটি সার্ভিস স্টেশন চালানোর প্রস্তাবনা দেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ১৯৩০ সালে এই সার্ভিস সেন্টার বন্ধ হয়ে গেল। নেমে এলো হতাশার চরম পর্যায়।

একই বছর কেন্টাকির “শেল ওয়েল কোম্পানি” তাকে আবারো একটি রেন্ট ফ্রি সার্ভিস স্টেশন চালানোর সুযোগ দিতে চাইলো। বিনিময়ে সেখানকার লভ্যাংশ থেকে ঐ কোম্পানিকে কিছু অর্থ দিতে হবে। স্যান্ডার্স আবারো তার রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করল। সেখানে সুস্বাদু চিকেনের সুনাম ছড়িয়ে পরল চারদিকে সেইসাথে তার কিছু প্রতিদ্বন্দ্বীও গড়ে উঠলো৷ সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জের ধরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটি বন্দুকযুদ্ধের সম্মুখীন হোন স্যান্ডার্স। তৎকালীন কেন্টাকি গভর্ণর “রুবি ল্যাফন” ১৯৩৫ সালে তাকে “কেন্টাকি কলোনেল” উপাধিতে ভূষিত করেন।

দ্বিতীয়বার কলোনেল উপাধিতে ভূষিত হবার পর এবং কেএফসির ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর হবার পর থেকে তাকে সাদা স্যুট ব্যতীত অন্য ধরনের পোশাক আর কখনো পরতে দেখা যায়নি। ব্র‍্যান্ডিং এর খাতিরে একনিষ্ঠতা দেখিয়েছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত

দেশজুড়ে কলোনেল স্যান্ডার্সের নাম ছড়িয়ে পরল। ১৯৩৯ সালের জুলাইতে নর্থ ক্যারোলিনায় একটি মোটেল নেন। আগুন লেগে সেই মোটেলটি ধ্বংস হয়ে যায় নভেম্বরের দিকে। কিছুদিন পর ১৯৪০ সালের জুলাই মাসে আবারো এটি পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু করেন। এবারে এর ধারনক্ষমতা হয় ১৪০জন। সেখানে আবারো ভাল সাড়া মিলল। কিন্তু ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবলে পরলে এই মোটেলটিও বন্ধ করে দিতে হয় তাকে। ভেঙে পরলেন কলোনেল স্যান্ডার্স।

১৯৪২ সালে অ্যাশভিলের নর্থ করবিন রেস্টুরেন্ট এন্ড মোটেলটি বিক্রি করে দেন। ১৯৪৭ সালে জোসেফাইনের সাথে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের পর বিয়ে করেন ক্লদিয়াকে। যিনি ছিলেন কলোনেল স্যান্ডার্সের বাকী জীবনের একটি শক্তিশালী হাত। তার অনুপ্রেরণায় প্রতিটি প্রতিকূল সময়কে জয় করেছিলেন তিনি।

ব্যবসার এ পর্যায়ের ধকল সামলে শেষমেশ তিনি ছোটখাটো ক্যাফেতে রান্নাবান্না এবং বাসন পরিস্কারের কাজ নিলেন। এভাবেই কেটে গেল জীবনের ৬৫টি বছর। সকল কর্ম থেকে অবসর গ্রহনের পর তিনি সরকারি অবসর ভাতা হিসেবে পেলেন মাত্র ১০৫ ডলার।

অবসর ভাতার এত কম অর্থে এই বয়সে কি করে নিজে চলবেন ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন তিনি আত্মহত্যা করবেন। সুইসাইড নোট লিখবার সময় আরেকবার ভাবলেন কি করেছেন এই জীবনে তিনি? কি শিখেছেন এই ৬৫বছর বয়সে? এই দীর্ঘজীবনে এমন কিছুই কি শিখেননি যা তার জীবনকে আরেকটিবার বাঁচার তাড়না দেয়??? মাথায় এলো তার রন্ধনশিল্পের দক্ষতার কথা। ছেলেবেলায় মা যখন বাইরে কাজে থাকতেন তিনিই তো ভাইদের রেঁধে খাওয়াতেন! আবার কর্মজীবনের একটা ভালো সময় তিনি কাটিয়েছেন রেস্টুরেন্টের রান্নাবান্নায়। আর সেসময় তার নিজের সিক্রেট রেসিপি “প্রেসার ফ্রাইয়িং” পদ্ধতিতে রান্না করা চিকেন চেটেপুটে খেতো সবাই। তিনি ঘুরে দাড়ালেন।

নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখলেন। ৮৭ ডলার খরচ করে রান্নার জিনিসপত্র কিনলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের দক্ষতায় বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরী করা চিকেন ফ্রাইয়ের হোম ডেলিভারি দিতে থাকলেন এখানে সেখানে। এই প্রথমবার তিনি তার সিক্রেট রেসিপি প্রেসার ফ্রাইয়িং প্রক্রিয়া কাজে লাগালেন। যা ছিল প্যান ফ্রাইয়িং সিস্টেমের চেয়ে বেশি লাভজনক, সময়সাপেক্ষ, এবং সুস্বাদু রান্নার পদ্ধতি। এর সাথে চললো একটি রেস্টুরেন্ট এর লাইসেন্স করবার চেষ্টা।  এখানে প্রায় ১০০৯ বার বিভিন্ন জায়গা থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। তার তৈরী চিকেন ফ্রাইয়ের নাম হলো বিশ্বময়। ১০১০তম বার চেষ্টায় তার চিকেন রেসিপির লাইসেন্স হয়। প্রিয় শহর কেন্টাকির নামে চিকেনের নাম।

কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেনের বিশ্ববিখ্যাত লোগো, হাস্যোজ্জ্বল কলোনেল স্যান্ডার্স

১৯৫২ সালে সাউথ সল্টলেকে জন্ম হয় কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন তথা কে.এফ.সি’র। প্রথম বছরের লভ্যাংশ দ্বিতীয় বছরে হয়ে যায় তিনগুণ। সে সময় ১৯৬৩ সালের দিকে স্থানীয়রা চিকেনের স্বাদকে বোঝাতে এক কথায় বলতেন “It’s Finger Lickin’ Good”

১৯৬৪ সালে ৭৩ বছর বয়সে তিনি কেএফসি’র সুনাম ধরে রাখার পাশাপাশি কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেনের ব্রান্ড এম্বাসেডর হোন। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে এবং বিদেশে ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণে বিপুল প্রশংসা কুড়ায় কেএফসি এবং কলোনেল স্যান্ডার্স। খাবারের স্বাদ, গুণ ও মানে শীর্ষস্থান ধরে রাখে কেএফসি।

মাঝে তৎকালীন সময়ের গভর্ণর বন্ধু “লরেন্স ওয়েদারবাই”  কর্তৃক আরো একবার কলোনেল উপাধিতে ভূষিত হোন তিনি। ৮৮ বছর বয়সে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পান একজন বহুমাত্রিক বিলিওনিয়ার হিসেবে এবং তার সেই  কে.এফ.সি. পৃথিবীজুড়ে সেকেন্ড ফুড কিংডম হিসেবে সমাদৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১২৩টি দেশে ২০ হাজারেরও বেশি আউটলেট আছে কে.এফ.সি’র।

কেএফসি বিশ্বব্যাপী বিপুল জনপ্রিয়তার স্বীকৃতিস্বরূপ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রেস্তোঁরা মালিকরা এই নামটি খাদ্যের মান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ কোন রেস্তোঁরায় যদি কেএফসির সমমানের খাদ্যমান বজায় রাখতে পারে তাহলে তাদেরকে এই নামে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কেএফসি ফাস্ট ফুড তাই এখন সারা বিশ্বে বিস্তৃত।

এতোক্ষন বলছিলাম সেই কে.এফ.সি’র প্রতিষ্ঠাতা কলোনেল স্যান্ডার্সের সফলতার গল্প। কর্মক্ষেত্রে হাজারো ত্যাগ, অপমান, দুঃখ, কষ্ট আর অবর্ণনীয় পরিশ্রমের পর তিনি তার জীবনের সফলতা পেয়েছিলেন ৮৮বছর বয়সে। সফলতা যদি হয়ে থাকে আপনার জীবনের লক্ষ্য তবে থেমে থাকলে চলবে না। স্বপ্ন দেখতে প্রয়োজন লক্ষ্য অর্জনের পথে হেঁটে চলা। এখানেই নেই কোনো বয়সের ভেদ।

“NEVER GIVE UP YOUR DREAM”
নিজের কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা, গুণগত শিক্ষা এবং কঠিন অধ্যাবসায়ই একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট। সৎ ও নিষ্ঠার সাথে সম্ভাবনার সমুখ পানে এগিয়ে চলা আপনিই একজন সফল উদ্যোক্তা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া।
ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

Advertisement

1 COMMENT

Leave a Reply to simin Cancel reply

Please enter your comment!
Please enter your name here